June 2, 2026, 1:54 am
শিরোনাম :
চৌদ্দগ্রামে মাদক ব্যবসায়ী ও কিশোর গ্যাং ৬ মাসের মধ্যে পরিবর্তন না হলে, আর ছাড় দেওয়া হবে না……বিরোধীদলীয় উপনেতা ডাঃ তাহের ৭নং ধর্মপুর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের নবগঠিত কমিটি আহ্বায়ক,মোঃ শাহাদাত হোসেন সদস্য সচিব,রাশেদুল হাসান রাশেদ ৭নং ধর্মপুর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী নোয়াখালীর সুবর্ণচরে মর্মান্তিক ঘটনা গ্রুপিং এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি প্রথা দলের ক্ষতির কারণ….মোঃ জিহাদ সায়মন অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ তুলে নোয়াখালীতে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হলে আপোষহীন, পরিশ্রমী ও ক্লিন ইমেজের নেতৃত্ব প্রয়োজন ১৫ বছর পর নোয়াখালী জেলা ক্রীড়া সংস্থার কারাতে কোচ হলেন আশরাফুল আলম সুমন নোয়াখালী জেলা পরিষদের প্রশাসক নিযুক্ত হলেন হারুনুর রশিদ আজাদ বর্নাঢ্য আয়োজনে হিল্লোল শিল্পীগোষ্ঠীর ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত

তারেক রহমানের বদলে যাওয়ার নেপথ্যে কারা, লন্ডন না ঢাকা?

Reporter Name

ঢাকা: দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর এক ‘নতুন’ তারেক রহমান বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যিনি দীর্ঘদিন ধরে ‘বিতর্কিত’, ‘সমালোচিত’ এবং ‘হাওয়া ভবনকেন্দ্রিক’ একটি অপবাদ বহন করে এসেছেন, ১৭ বছর পর দেশে ফিরে তিনি যেন হাজির হয়েছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রাজনৈতিক অবয়বে।

প্রতিহিংসার বদলে সংলাপ, প্রতিপক্ষতার বদলে ঐকমত্য এবং ক্ষমতা প্রদর্শনের বদলে সংযম- তার এই নতুন রাজনৈতিক ভাষ্য হঠাৎ করে গড়ে ওঠেনি বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এই রূপান্তরের নেপথ্যে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে লন্ডনে দীর্ঘ নির্বাসিত সময়ে গড়ে ওঠা তারেক রহমানের একটি নতুন বলয়, যা ধীরে ধীরে তার রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা, আচরণ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরনকেই বদলে দিয়েছে।

তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম অন্ধকার অধ্যায় শুরু হয় ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত ‘এক এগারো’ হিসেবে পরিচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। সে সময় তাকে ঢাকা সেনানিবাসের মইনুল রোডের বাসভবন থেকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় চাঁদাবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগে একাধিক মামলা। গ্রেফতারের পর তাকে রিমান্ডে নিয়ে অমানবিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছে- এমন অভিযোগ তোলে তার পরিবার এবং দল।

তাদের দাবি অনুযায়ী, সে সময় তার মেরুদণ্ড গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে তার দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন দেখা দেয়। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ২০০৮ সালে তৎকালীন সরকারের সঙ্গে একটি রাজনৈতিক সমঝোতার প্রেক্ষাপটে তিনি উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান। সে সময় ‘আর রাজনীতি করবেন না’- এমন একটি অঘোষিত মুচলেকার কথা আলোচনায় এলেও বিএনপি বরাবরই এই দাবি অস্বীকার করে একে রাজনৈতিক অপপ্রচার হিসেবে আখ্যা দিয়ে এসেছে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মামলায় তারেক রহমানের নাম সম্পূরক অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ২০১৮ সালে এই মামলায় তাকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। একই সময়ে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায়ও তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব মামলার একাধিকটিতে যথাযথ তথ্য-প্রমাণের ঘাটতির প্রশ্ন উঠলেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রেক্ষাপটে তাকে পলাতক দেখিয়ে বিচারকার্য সম্পন্ন করা হয়েছিল। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনে সশরীরে দেশে উপস্থিত থাকতে না পারলেও ভার্চুয়াল যোগাযোগের মাধ্যমে তারেক রহমান এ সময় দলের নেতৃত্ব ধরে রাখেন এবং দমন-পীড়নের মধ্যেও দলীয় কাঠামো ও আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সচেষ্ট ছিলেন।
নির্বাসিত জীবনে তারেক রহমানকে শুধু রাজনৈতিক লড়াইই নয়, মোকাবিলা করতে হয়েছে একের পর এক ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিও।

দেশে থাকা তার মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ওপর চলতে থাকে চরম রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। ২০১০ সালে ক্যান্টনমেন্টের ৬ নম্বর শহীদ মইনুল রোডের স্মৃতিবিজড়িত বাসভবন থেকে তাকে উচ্ছেদ করা হয়। সেদিন স্বামীর স্মৃতিঘেরা ওই বাড়ি থেকে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে এক কাপড়ে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল- যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীরভাবে দাগ কেটে থাকা এক কালো অধ্যায় বলে মনে করেন রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিনবারের প্রধানমন্ত্রীকে এভাবে উচ্ছেদ করা ছিল চরম অমানবিক ও প্রতিহিংসাপরায়ণ সিদ্ধান্ত।
এর পরপরই বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলাসহ একের পর এক মামলা দায়ের করা হয়, যা বিএনপির ভাষায় ছিল রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বিরোধী নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করার ধারাবাহিক প্রচেষ্টা।

২০১৫ সালে তারেক রহমান হারান তার একমাত্র ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোকে। মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কোকোর মৃত্যু হয়। আরাফাত রহমান কোকোকেও ২০০৮ সালে উন্নত চিকিৎসার অজুহাতে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল বলে বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। দীর্ঘ নির্বাসনে থাকার কারণে তারেক রহমান একমাত্র ভাইকে শেষ দেখাটুকুও দেখতে পারেননি, যা তার ব্যক্তিগত জীবনের এক গভীর বেদনাবিধুর অধ্যায়।

এর তিন বছর পর, ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বেগম খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলে দলীয় সিদ্ধান্তে তারেক রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সে সময় পুরোনো ঢাকার কারাগারের স্যাঁতসেঁতে কক্ষে পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবে অসুস্থ অবস্থায় বন্দিজীবন কাটাচ্ছিলেন তার মা। আর সেই মুহূর্তে প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার দূরে থেকে তারেক রহমান ভার্চুয়াল যোগাযোগের মাধ্যমে দলকে সংঘবদ্ধ ও সক্রিয় রাখার জন্য তিনি আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান।

সে সময় দলের জ্যেষ্ঠ নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ নিয়মিত গায়েবি মামলা, গ্রেপ্তার ও গুমের শিকার হচ্ছিলেন। রাজপথে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া তো দূরের কথা, পল্টনের দলীয় কার্যালয়ের সামনে শান্তিপূর্ণভাবে দাঁড়ালেও অনেক নেতাকর্মীকে টেনেহিঁচড়ে প্রিজন ভ্যানে তুলে নেওয়া হয়েছে- এমন অভিযোগ ছিল নিত্যদিনের। বছরের পর বছর থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের অসংখ্য নেতাকর্মী এসব মামলার ভয়ে পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য হন। নিজ নিজ এলাকায় দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে ফিরতে পারেননি হাজার হাজার বিএনপির নেতা-কর্মী ও সমর্থক। গুমের শিকার হয়ে আর ফিরে আসেননি চৌধুরী আলম, ইলিয়াস আলী কিংবা সাজেদুল ইসলাম সুমনের মতো বিএনপি নেতারা। তারা আজ বেঁচে আছেন কি না- এ প্রশ্নের উত্তর এখনো তাদের পরিবারের কাছে অজানা। তারা মৃত কি না, কিংবা মৃত্যু হলে তাদের মরদেহের পরিণতি কী হয়েছে, দাফন হয়েছিল কি না- এই ন্যূনতম তথ্যটুকুও কোনো পরিবার আজও জানতে পারেনি।